২রা আষাঢ়, ১৪৩১| ১৬ই জুন, ২০২৪| ৯ই জিলহজ, ১৪৪৫| সকাল ৯:৪৪| বর্ষাকাল|

তরুণ প্রজন্ম ও অভিভাবক

Reporter Name
  • Update Time : বুধবার, ২০ এপ্রিল, ২০২২
  • ২১২ Time View

দীপা সিনহা :
শুধু মেধা থাকলেই কি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া যায়? সঙ্গে মননশীলতা, একাগ্রতা আর অধ্যাবসায়েরও প্রয়োজন হয়। এমন পড়ুয়া, মেধাবী বুদ্ধিদীপ্ত সন্তানরা উচ্চশিক্ষার দ্বারে পা রেখে কি করে দুর্ধর্ষ হয়ে ওঠে! কোথায় পায় এই দুঃসাহস? এ প্রশ্ন আজ সবার মনেই। সমাজে আজ শিক্ষিত-অশিক্ষিত দরিদ্র ঘরের সন্তানরা যা করছে, ধনীর ঘরের সন্তানরাও একই কাজ করছে। খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাস, মাদক সেবন সবটাতেই সবাই যেন এক অবস্থানে। ইদানীং রাস্তায় বেরুলে আরও একটি ভয়াবহ দৃশ্য চোখে পড়ে। কিশোর বয়সের ছেলেরা দলবদ্ধ হয়ে যুদ্ধংদেহী ভাব নিয়ে মধ্য রাস্তা দিয়ে হুঙ্কার দিয়ে হেঁটে চলে। বড়দের কোন তোয়াক্কা তারা করে না। দেখে মনে হয় কোথাও কোন অঘটন ঘটাতে চলেছে বা ঘটিয়ে এলো। পত্রিকায় অবশ্য এমন খবরও আসে যে, কিশোররা মার্ডার করে আনন্দ মিছিল করতে করতে ঘরে ফিরেছে। এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যের ভবিষ্যত কি? এদের দায় কে নেবে? চারদিকের সবটা দেখেশুনে মনে হয়, দেশটা যেন প্রায় অভিভাবকশূন্য হয়ে গেছে।

আমাদের সন্তানরা আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে লাশ হয়ে ঘরে ফিরছে। সন্তানদের জন্য ফাঁসির মঞ্চ সাজাতে হচ্ছে। একজন আবরারের মায়ের বুক চাপড়ানো কান্নার সঙ্গে আরও বিশজন মায়ের কান্না যোগ হতে চলেছে। পৃথিবীর বুকে একজন মায়ের জন্য এর চেয়ে বড় শাস্তি আর কি হতে পারে? সমাজ কতটা নষ্ট হলে দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উজ্জ্বল নক্ষত্রের ন্যায় এক ঝাঁক মেধাবী ছাত্রকে ফাঁসিতে ঝুলতে হয়! বিশ্বজিৎ হত্যাকা-ের কথা কিন্তু আজও অনেকের মন থেকে মুছে যায়নি। দুঃখের বিষয় হলো, সেই হত্যাকারী ছিল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েরই একদল ছাত্র।

নানাভাবে সমাজ কলুষিত হচ্ছে। রাজনীতির প্রতিশোধপরায়ণতায় লিপ্ত হওয়া এবং মাদক সেবন থেকে কিশোররাও বাদ নেই। বিনোদনের নামে চলছে অশ্লীলতা ও যৌনাচার। যত্রতত্র ধাঁধা বা খেলার নামে চলছে কুরুচিপূর্ণ অশ্লীল ভাষার ব্যবহার। অসামাজিক ও অনৈতিক জীবনযাপনের সবটাই সহজলভ্য। এহেন অবস্থান থেকে পরিত্রাণের উপায় কি? এর রাশ কে টেনে ধরবে? ওদের ভবিষ্যতের কথা ভাববে কে? নিজেদের স্বার্থে যারা ভবিষ্যত প্রজন্মকে ব্যবহার করছে, তাদের কাছে কি আশা করা যায়? তবে, এখনই যদি আমরা এর রাশ টেনে না ধরি, অবস্থা আগামীতে কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে তা কি ভাবা যায়?

আজ-কাল অনেক ইস্যুতেই আন্দোলন গড়ে ওঠে। ইস্যুকে কেন্দ্র করে মানুষ হয়ে ওঠে সোচ্চার। তবে একটি ইস্যুর আন্দোলন মনকে ভীষণভাবে আপ্লুত করে তোলে। সেটা হলো- গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে সহপাঠীর মৃত্যুতে যখন স্কুলের ছোট ছোট ছাত্র প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে। তখন মনে হয়, ওদের এই আওয়াজ যেন ওদের সহপাঠীদের জন্য কান্নারই আওয়াজ। ভাললাগার পাশাপাশি মনে আবার সংশয় জাগে, এই এরাই যে একদিন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রেখে পাল্টে যাবে না তার নিশ্চয়তা কি?

তাই সকল আন্দোলনের মাঝে, আরেকটি আন্দোলনের বিশেষ প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য করে গড়ে তুলতে দেশজুড়ে আরেকটি আওয়াজ তুলতে হবে। আমাদের সন্তানদের জন্য সুস্থ সমাজ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে হতে হবে সোচ্চার। আর তাতে প্রথম আওয়াজটি তুলতে হবে মা-বাবা ও শিক্ষককেই। কথায় আছে, যার ঘা তার ব্যথা। কারণ, সন্তান তো তাদেরই। এখানে একজনের কথা উল্লেখ করতেই হয়। ভারতের রাষ্ট্রপতি দার্শনিক এপিজে আবদুল কালাম একটি চমৎকার কথা বলেছেন, যদি একটা সুন্দর মনের মানুষের জাতি হতে হয় তা হলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, এক্ষেত্রে তিনজন সামাজিক সদস্য পার্থক্য এনে দিতে পারে, তারা হলেন-বাবা-মা ও শিক্ষক।

দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে যে, আমরা সেই সব বাবা-মা ও শিক্ষককে বোধহয় আজ হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের মায়েদের আদর্শলিপি কি এখন হৃদয় দিয়ে পাঠ হয়? অনেক শিক্ষককে আজকাল বেশিরভাগ সময় নিজেদের পদ-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যেন আজ আর আগের মতো নেই। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বাণিজ্যনির্ভর হয়ে পড়েছে। এর মাঝে ছেলেমেয়েরা সুস্থ মানসিকতা নিয়ে গড়ে উঠবে কি করে? মানুষের মধ্যে যে নৈতিক স্খলন ঘটেছে এর পুনরুদ্ধার ঘটাতে হবে। ফিরিয়ে আনতে হবে সেই সব নীতি-নৈতিকতাপুষ্ট পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ছাত্র-শিক্ষক আর অভিভাবকের সমন্বয়েই সমাজ বিবর্তনের প্রথম আওয়াজটি তুলতে হবে। হিংসা-দ্বেষ, খুন-খারাবি আর বিনোদনের নামে অসামাজিক কর্মকাণ্ডের সহজলভ্যতা ও যত্রতত্র অশ্লীল ভাষার ব্যবহার- এ সবই বন্ধে দেশের সকল মানুষকে জাগিয়ে তুলতে হবে। প্রথমত প্রতিটি বাবা-মা আর শিক্ষককেই এ দায়িত্বটি নিতে হবে। কারণ, সন্তান তো তাদেরই।

অতীত ইতিহাস বলে, ‘আমাদের সন্তানরা কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে খুন হয়নি, খুনীও হয়নি, হয়েছে শহীদ। তারা দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছে। এ দেশ তো সেই সব শহীদ সন্তানের মায়েদেরই অহঙ্কারের দেশ। এ দেশের মায়েদের সন্তানরা সন্ত্রাসী, খুনী, ধর্ষক ও জঙ্গীর পরিচিতি পেতে পারে না। এ সবের অবসান ঘটাতেই হবে।

লেখক : সাহিত্যসেবী

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category