২রা আষাঢ়, ১৪৩১| ১৬ই জুন, ২০২৪| ৯ই জিলহজ, ১৪৪৫| সকাল ৮:৫৪| বর্ষাকাল|

অমর একুশের ৭০ বছরে সর্বস্তরে বাংলা চাই-২

Reporter Name
  • Update Time : রবিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২২
  • ২৮৩ Time View

মোস্তাফা জব্বার :

যন্ত্রের সঙ্কট, পরিভাষার সঙ্কট, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ব্যবহারের অভিজ্ঞতার অভাব, এমনকি দক্ষ টাইপিস্টের অভাবেও বঙ্গবন্ধু সর্বশক্তি দিয়ে সরকারের ভাষা হিসেবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করেন। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর বাংলার সেই সুদিন আর থাকেনি। জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করে সবকিছুর ইংরেজিয়ানা চালু করেন এবং তার আমলেই বাংলার দাপ্তরিক প্রচলন কমতে কমতে শূন্যের কোঠায় গিয়ে নামে। জয় বাংলাকে তিনি যেমন বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বানান, তেমনি করে বাংলাকে ইংরেজী দিয়ে স্থলাভিষিক্ত করেন। এরপর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বাংলা ভাষা প্রচলন আইন করলেও বাংলা প্রচলনের স্রোতটাকে সঠিক খাতে প্রবাহিত করতে পারেননি। বর্তমান সরকার স্বৈরাচারী সরকারসমূহের স্রোতটাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে একটি নতুন মাত্রা যোগ করে। কিন্তু এটি বাস্তবতা যে, বঙ্গবন্ধু অতি স্বল্প সময়ে যতটা পথ এগোতে পেরেছিলেন আমরা ততটা পথ পাড়ি দিতে পারিনি। সরকারী কাজে বাংলা ব্যবহার ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হলেও মানুষের জীবনের সর্বস্তরে এর বিস্তারকে আমরা ব্যাপক করতে পারিনি। বরং এটি বাস্তবতা যে, সরকারে বাংলা ভাষা প্রচলনের অগ্রগতি হলেও সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের যে আকাক্সক্ষাটি আমাদের রয়েছে সেটির পুরোপুরি বাস্তবায়ন এখনও হয়নি। বরং প্রযুক্তিগত সকল সক্ষমতা থাকার পরেও বাংলা ভাষাকে শিকলবন্দী করার, বাংলা হরফকে বিদায় করার ও ডিজিটাইজেশনের নামে রোমান হরফ দিয়ে বাংলা বর্ণকে স্থলাভিষিক্ত করার একটি অস্থির প্রক্রিয়া চারপাশে চলমান দেখতে পাচ্ছি। বাংলাদেশের কেউ কেউ এখন বিনা দ্বিধায় রোমান হরফ ব্যবহার করে। ফলে বাংলা ভাষার পাশাপাশি বিপন্ন বাংলা হরফ।

সাম্প্রতিককালে রোমান হরফ দিয়ে বাংলা লেখার একটি প্রবণতা দিন দিন সম্প্রসারিত হচ্ছে। রোমান হরফে বাংলা লেখা বইও নাকি প্রকাশিত হয়েছে। আমি চারপাশে এই রোমান হরফের জয়জয়কার দেখতে পাই। কেউ যদি রোমান হরফ দিয়ে মেল খোলে বা ফেসবুকের আইডি খোলে তবে তাকে আমি তেমন দায়ী করব না। এমন হতে পারে যে, বাংলা হরফ যে এসব খাতে ব্যবহার করা যায় সেটি হয়ত তারা জানে না। রোমান হরফ ব্যবহার করতে করতে এটি হয়ত তাদের প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। এছাড়া ডিজিটাল যন্ত্রে বাংলা লেখার অদক্ষতাকেও বিবেচনায় নিতে হবে। আমাদের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে বাংলা বা ইংরেজী কোন ভাষার টাইপিং শেখানো হয় না। সারাজীবন তাদেরকে এই অদক্ষতার ভার বহন করতে হয়। ডিজিটাল যুগে সেটি আরও প্রকট হয়েছে। ওরা কোন পেশাদারী কোর্স করলে বা অন্য কোথাও বাংলা টাইপ করতে গেলে প্রায়ই রোমান হরফ দিয়ে বাংলা লিখতে শেখানো হয়। বিশেষত ইন্টারনেটে রোমান হরফ দিয়ে বাংলা লেখার একটি হুজুগ কাজ করে। এর সূচনাটি মোবাইল দিয়ে হয়ত শুরু। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে যে, সরকার তার নিজের প্রমিত কীবোর্ড সরকারী অফিসে ব্যবহার করায় না। যার যা খুশি সেটাই ব্যবহার করে। বাংলা ভাষাকে সর্বস্তরে চালু করার ক্ষেত্রে এটি হচ্ছে একটি বিশালতম অন্তরায়।

রোমান হরফ দিয়ে আমরা এসএমএস পাঠাতাম বা ফেসবুকে ও মেলে রোমান হরফ ব্যবহার করতাম যখন এসব ক্ষেত্রে বাংলা লেখার সুযোগ ছিল না। কিন্তু এখন যখন সকল ডিজিটাল যন্ত্রে বাংলা লেখার সুযোগ রয়েছে তখনও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা ইনস্ট্যান্ট ম্যাসেজে রোমান হরফ ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়। অথচ প্রকৃত অবস্থা হলো ইন্টারনেটে রোমান হরফে বাংলা লেখার কোন প্রয়োজনীয়তাই নেই। ওখানে বাংলা লেখার সকল সুবিধাই বিরাজ করে। কারিগরি দিক থেকে মোবাইলে বাংলা প্রচলনে কোন অসুবিধা নেই। এরই মাঝে সরকার সকল মোবাইলে বাংলা থাকা বাধ্যতামূলকও করেছে। সরকার মোবাইলের সকল তথ্য ব্যবহারকারীকে বাংলা ভাষায় প্রদানের নিয়ম বাধ্যতামূলক করেছে। ফলে মানসিকতা ঠিক করতে পারলে মোবাইলে বাংলা লেখা পরিপূর্র্ণভাবে সফল হবে। অন্যদিকে কেবল মোবাইল ফোনে নয়, অন্য ক্ষেত্রেও বাংলা ভাষার রোমানাইজেশন আরও প্রবলভাবে হচ্ছে। ইন্টারনেট থেকে ফ্রি ডাউনলোড করা যায় এমন একাধিক বাংলা সফটওয়্যারে ইংেরজীতে বাংলা লিখলে সেটি বাংলা হরফে পরিণত হয়। ফলে বাংলা লেখার জন্য বাংলা হরফ জানার দরকার হয় না। যদিও এই পদ্ধতিতে বাংলা পুরোপুরি লেখা যায় না, নির্ভুলভাবে লেখা যায় না বা দ্রুত গতিতে লেখা যায় না তথাপি এটি দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। কিছু লোক যে কোনভাবে, যে কোন বানানে বা যে কোন উচ্চারণে এভাবে বাংলা লিখছে। বাংলা বিকৃত হলেও তাতে তাদের কিছু আসে যায় না। আমি আগেই বলেছি এই পদ্ধতিটিকে সহায়তা করেছে কিছু বিদেশী সংস্থা ও তাদের উপকারভোগী বিভিন্ন সংস্থা। খুব সহজেই তাদের কর্মকা- থেকে ধরে নেয়া যায় যে, বাংলা ভাষা রোমান হরফে লেখার যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করা এসব মহলের একান্ত দায়িত্ব হয়ে আছে।

যদি আরও একটু গভীরে তাকাই তবে আমরা বাংলা ভাষা ও হরফকে নিয়ে আরও অনেক ষড়যন্ত্র দেখতে পাব। বাংলা ভাষার হরফ পরিবর্তন, যুক্তাক্ষর বাদ দেয়া, অক্ষরের আকৃতি বদলানো, মূল বর্ণের কয়েকটিকে বাদ দেয়া, বানান ও ব্যাকরণ সংস্কার বা লেখন পদ্ধতি পরিবর্তনের প্রস্তাবও দেখেছি আমরা। এমনকি যুক্তাক্ষর বর্জন করার প্রস্তাবও আমরা দেখেছি। যন্ত্রে প্রয়োগ করার নামে, ভাষাকে সহজ করার নামে, ব্যবহারের সুলভ পথ খুঁজে বের করার নামে এসব নানা প্রসঙ্গ বহুদিন ধরে বহুভাবেই আলোচিত হয়েছে। ইতিহাসের পাতায় এসব প্রস্তাবের পক্ষের ও বিপক্ষের মানুষের নাম-ধাম সবই পাওয়া যাবে। আমি সেই মহামানবদের নাম পুনরায় স্মরণ করাতে চাই না। তবে কষ্ট হয় যখন দেখি আমাদের কাছে সম্মানিত ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিরাও এসব অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তবে আমাদের জন্য সবচেয়ে সুখের বিষয়টি হলো এতসব প্রস্তাবনার পরেও বাংলা ভাষাকে কেউ এখন পর্যন্ত তার মূল স্রোত থেকে সরাতে পারেনি। এখনও বাংলা ভাষার হরফমালা অবিকৃত রয়েছে। কেউ কোন হরফকে বাদ দিতে পারেনি বা নতুন কোন পদ্ধতি আমাদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারেনি। এখনও বাংলা ভাষার বানানে বৈচিত্র্য রয়েছে এবং নানাভাবে নানা শব্দে বাংলা ভাষা প্রতিদিনই সমৃদ্ধ হচ্ছে। বরং নানা আক্রমণে, নানা বিবর্তনে বাংলা ভাষা তার অকৃত্রিমতা হারায়নি।

কিন্তু বাংলা ভাষার সঙ্কট রয়ে গেছে। এই ভাষার সবচেয়ে বড় সঙ্কটটি হচ্ছে বাংলা প্রচলনে সকল মহলের আন্তরিকতার অভাব। এটি বিস্ময়কর মনে হতে পারে যে, বাংলা ভাষার নামে জন্ম নেয়া দেশে সেই ভাষার জন্য সকলের পৃষ্ঠপোষকতা যথাযথ নয় কেন? যথাযথ কর্তৃপক্ষকে সর্বস্তরে বাংলা প্রচলন করতে হবে। যদিও সরকারের প্রধান ব্যবহারগুলো বাংলাকেন্দ্রিক তথাপি উচ্চ আদালতে বাংলা ব্যবহার না হওয়াটাও দুঃখজনক। ওখানে বিচারক বাঙালী, বাদী-বিবাদী বাঙালী, আইন বাংলায় অথচ বিচারকার্য, এমনকি রায়ও বাংলাতে হয় না। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে সেই শিকলটা আমরা ভাঙতে পারিনি। দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় উচ্চ আদালতে বাংলা প্রচলন করতে না পারার জন্য একটি মাত্র বিধি (দেওয়ানি কার্যবিধির ১৩৭ ধারা) সংশোধন করার কথা বলা হয়েছে। এটি কি আমরা ভাবতে পারি যে, এত বছরে একটি বিধি সংশোধন করা যায় না? অন্যদিকে সরকারী কাজে বাংলা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও বেশ কিছু বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি দেয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সরকারী ডিপিপিগুলো এখনও ইংরেজীতে হয়। অথচ ডিপিপি বাংলায় তৈরিতে কোন অসুবিধা নেই। এমনকি বিদেশীরাও মত দিয়েছে যে, বাংলা ডিপিপিতে তাদের কোন সমস্যা হয় না। গাইডলাইন বা নীতিমালাগুলো ইংরেজীর বদলে বাংলায় করা যায়। এখন অবশ্য ইংরেজীকেও বাংলায় রূপান্তর করা হচ্ছে বা অন্তত দ্বিভাষিক করা হচ্ছে। টেলিকম নীতিমালা ও আগের আইনগুলো আমি বাংলা করছি। সরকারী উপস্থাপনাগুলো বাংলাতেই হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই এখন সেটি হচ্ছে। সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভাগুলো বাংলায় সাইনবোর্ড ঝোলানো বাধ্যতামূলক করতে পারে। ২২ সালের একুশে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে এমন একটি উদ্যোগ নিতে দেখেছি। তবে একুশে ফেব্রুয়ারির পর আবার তা হারিয়ে গেছে। আমি কোন কারণ খুঁজে পাই না বাংলাদেশের সাইনবোর্ড কেন বাংলা বর্ণে লেখা হবে না?

একটি অতি দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে যে, উচ্চশিক্ষার বাহন হিসেবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করা যায়নি। এক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো আমরা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় প্রাপ্ত জ্ঞানভান্ডারকে বাংলায় রূপান্তর করিনি। অথচ খুব সহজেই পাঠ্যবই বা বিশ্বের জ্ঞানভান্ডার বাংলায় অনুবাদ করা যায়। বাংলা একাডেমি বা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউট এই দায়িত্ব নিতে পারে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনও এই দায়িত্ব নিতে পারে। অথচ কারও পক্ষ থেকেই এমন উদ্যোগ নেবার লক্ষণই দেখছি না।

বাংলা শেখার ক্ষেত্রেও সঙ্কট আছে। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শতকরা দশ ভাগের এক ভাগেও বাংলা শেখানো হয় না। যে কটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়ানো হয় সেগুলোই বাংলায় প্রশাসন চালায় না। তাদের কর্মকান্ডে বাংলা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। একই অবস্থা আর্থিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে। তারাও তাদের কাজকর্মে বাংলা ব্যবহার করে না। অথচ বঙ্গবন্ধুর শাসনকালে এমনকি ব্যাংকগুলোও তাদের সকল কাজ বাংলায় করত। আন্তর্জাতিক যোগাযোগে ইংরেজী ব্যবহার হতেই পারে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে ইংরেজী ব্যবহার করার কোন যৌক্তিক কারণ নেই। কিন্তু সেটিই হচ্ছে।

বাংলার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরির জন্য ২০১৭ সালে শুরু করা সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের আওতায় চলমান বাংলা ভাষার উন্নয়ন প্রকল্পটির কাজ অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করা উচিত। এই প্রকল্পের কাজ শেষ হলে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার ইংরেজী বা রোমান ভাষাগুলোর মতোই দক্ষতাসম্পন্ন হবে। বাংলা বানান শুদ্ধকরণ, ব্যাকরণ শুদ্ধকরণ, কথা থেকে লেখা ও লেখা থেকে কথায় রূপান্তর, ওসিআর, স্বয়ংক্রিয় অনুবাদ ইত্যাদি সবই বাংলায় করা সম্ভব হবে। পাঁচটি বছর যাবার পরও কাজটি তেমন আগায়নি।

অমর একুশের ৭০ বছর পূর্তিতে দুটি সুখবর দিতে পারি। এবার আমরা বাংলা এসএমএস-এর দাম অর্ধেক করার পাশাপাশি মোবাইল থেকে গ্রাহকের কাছে সকল তথ্য বাংলায় দেবার বিষয়টি নিশ্চিত করেছি।

ঢাকা, ২২ এপ্রিল ২০২২

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাস-এর চেয়ারম্যান- সাংবাদিক, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যার-এর জনক

mustafajabbar@gmail.com

www.bijoyekushe.net.bd

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category