২রা আষাঢ়, ১৪৩১| ১৬ই জুন, ২০২৪| ৯ই জিলহজ, ১৪৪৫| সকাল ৮:৩২| বর্ষাকাল|

আজও মজুরি বৈষম্য কেন?

Reporter Name
  • Update Time : মঙ্গলবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪
  • ২৭ Time View

জয় বাংলা ডেস্ক :

কুড়িগ্রামের বেলগাছা ইউনিয়নের আতারাম গ্রামের ষাটোর্ধ্ব সোনাভান বিবি। এক চোখ অন্ধ। স্বামী মজিবর রহমান প্রায় দুই দশক আগে মারা গেছে। বড় ছেলের সঙ্গে থাকেন। অভাবের সংসার তাদের। বাধ্য হয়ে এ বয়সেও সারা বছর কাজ করে। কৃষি শ্রমিক সোনাভান বিবি। যখন কাজ থাকে না তখন মানুষের বাড়িতে কাজ করে। কৃষি শ্রমিকের কাজ করে পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় কম মজুরি পান তিনি। এ নিয়ে তার কোনো অভিযোগ নেই । যা পায় তা দিয়েই চলে তার জীবন। এত অল্পতেই খুশি তিনি।

একই অবস্থা একই গ্রামের রমিছা বেগমের (৫৯)। তার স্বামী অসুস্থ। সন্তানরা তাদের ছেড়ে আলাদা থাকেন। জীবন বাঁচাতে এ বয়সেও জমিতে কাজ করেন তিনি। কাজ না থাকলে ভীষণ কষ্ট হয়। অভাব-অনটন লেগেই থাকে প্রতিনিয়ত। আশপাশের ধনঞ্জয়, মুক্তরাম, কালিরহাট, গ্রামের রতœা (৩৫), সাহেরা বেগম (৪৫), জরিনা বেগম (৫২), অঞ্জলী রানী (৪৫) এরা সবাই কৃষি শ্রমিক। পুরোপুরি শ্রমের উপর নির্ভরশীল। তারা জানান তাদের এলাকায় প্রতি বছর ধান,আলু, সরিষা, ভুট্টাসহ বিভিন্ন আবাদ করি।

সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত একটানা জমিতে কাজ করে মজুরি পান ২শ’ টাকা। অথচ একই কাজ করে পুরুষরা মজুরি পায় ৪শ থেকে ৪৫০ টাকা। পুরুষরা কাজের অবসর পায় দুপুরে। অথচ নারী শ্রমিকরা টানা কাজ করে মজুরি কম পায়। কিন্তু কেন তাদের মজুরি কম নিজেও জানে না। কুড়িগ্রামসহ সারাদেশে নারী শ্রমিকদের সংখ্যা বাড়লেও নারী শ্রমিকদের মজুরি বাড়েনি। জেলায় ৮০ শতাংশ নারী পুরুষদের পাশাপাশি বিভিন্ন কাজ করে। শুধু মাত্র চর-দ্বীপচরগুলোতে ৫৩ শতাংশ নারী কাজ করে।

প্রতিনিয়ত তারা মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে- বাংলাদেশের শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ ৩৬ শতাংশের মতো। গত কয়েক দশকে কৃষি, শিল্প ও সেবাখাতে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের অংশগ্রহণ দৃশ্যমান। এখানে নারী-পুরুষের মজুরি বৈষ্যমের বিষয়টি উদ্বেগের। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আই এল ও ) সূত্রে জানা গেছে বিশে^ নরী-পুুরুষের আয়ের বৈষম্য ২২ শতাংশ। শুধু বাংলাদেশে নারীদের মজুরি বৈষম্য ২ শতাংশ।
দেশের সর্বউত্তরের শেষ প্রান্তরের জেলা কুড়িগ্রাম। ১৬টি নদ-নদী রয়েছে এ জেলায়। চর-দ্বীপচর রয়েছে ৪০৫টি। এসব এলাকার অধিকাংশ মানুষ শ্রমজীবী। জীবনটাকে বাঁচিয়ে রাখতে পুরুষ-মহিলা সকলেই কৃষি কাজ করে এখানে। জেলায় মোট নারীর সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ। এ জেলায় পুরুষদের তুলনায় নারীদের সংখ্যায় বেশি। অধিকাংশ নারী কোনো না কোনো কাজে জড়িত। বিশেষ করে কৃষি কাজে সবচেয়ে বেশি জড়িত।

এসব নারীরা প্রতিনিয়ত মজুরি বৈষম্যের শিকার হয়। তারপরও প্রতিবাদ করে না। কাজটি যদি হারায় এ ভয় প্রতিনিয়ত। কুড়িগ্রাম মহিলা পরিষদের সম্পাদক প্রতিমা রানী চৌধুরী জানান নারীর মজুরি বৈষম্য সারা দেশের মতো এখানেও। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ দীর্ঘদিন থেকে সরকারকে প্রস্তাব দিয়ে আসছে নারী-পুরুষের সমতা আনতে গেলে প্রথমে মজুরি বৈষম্য দূর করতে হবে। তিনি আরও বলেন পুরুষের চেয়ে নারী শ্রমিকরা অনেক বেশি কাজ করে। এবং কাজে ফাঁকি দেয় না।

অথচ তারা প্রতিনিয়ত মজুরি বৈষ্যমের শিকার হয়। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার জন্য এমনটি হয় বলে তিনি মনে করেন। নারী শিক্ষা নিষেধের যুগে শিক্ষার আলো জ্বেলে অবরোধ ভেঙ্গে ছিলেন রংপুরের বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত। ধর্মান্ধ সমাজে তার এ জীবন বোধ ভারতবর্ষজুড়ে প্রতিষ্ঠিত করেছিল তাকে নারী জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে। কিন্তু রোকেয়ার এ অঞ্চলের নারীরা এখনো পিছিয়ে। এখানকার চর-দ্বীপচর ও সীমান্তবর্তী নারীরা আজও সচেতন হতে পারেনি।

তারা পরিবারের দেখাশোনা আর সংসারের আয় উন্নতির ভূমিকা রাখাকেই তারা মূর্খ দায়িত্ব ভেবে পার করে দিচ্ছেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম। কৃষিনির্ভর এ অঞ্চলে আজও মজুরি বঞ্চিত নারীরা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নারীরা পরিশ্রম এবং কর্মস্পৃহায় পেরিয়ে গেলেও এখনও নারীরা পায় না তাদের ন্যায্য মজুরি। শুধুমাত্র শারীরিক সমতার দোহাই দিয়ে নারীদের বৈষমের শিকার করা হয়।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category