৫ই শ্রাবণ, ১৪৩১| ২০শে জুলাই, ২০২৪| ১৩ই মহর্‌রম, ১৪৪৬| বিকাল ৪:১৪| বর্ষাকাল|

চোরাইপথে দেদার আসছে মিয়ানমার ও ভারতের গরু

Reporter Name
  • Update Time : শুক্রবার, ১৪ জুন, ২০২৪
  • ১০ Time View

জয় বাংলা ডেস্ক :

কুরবানির ঈদ উপলক্ষে ভারত ও মিয়ানমার থেকে গরু আসবে না- সরকারের এমন ঘোষণায় আশায় বুক বেঁধেছিলেন দেশি খামারিরা। কিন্তু বাস্তবচিত্র উল্টো। ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে প্রতিবেশী দেশ দুটি থেকে অবৈধভাবে গরু আসছে ব্যাপক হারে। এভাবে গরু আনার নেপথ্যে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী, প্রশাসনের লোকজনও জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লা সীমান্তের ৫টি পয়েন্ট দিয়ে দেদার আসছে ভারতীয় গরু। ভারতীয় গরু আসছে লালমনিরহাট সীমান্ত দিয়েও। এ ছাড়া পার্বত্য জেলা বান্দরবানের সীমান্ত উপজেলা নাইক্ষ্যংছড়ির বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে অবৈধভাবে আসছে মিয়ানমারের গরু।

কুমিল্লা: কুরবানি ঈদ সামনে রেখে কুমিল্লা সীমান্তের ১০৬ কিলোমিটার অংশের পাঁচটি পয়েন্ট দিয়ে ভারতীয় গরু আনছে চোরাকারবারিরা। তারা এসব পশু সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন গ্রামে দেশি গরুর সঙ্গে মিশিয়ে রাখে। পরে এ পশু হাটে বিক্রি করছে। গরুগুলো দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ক্রেতারা নিয়ে যাচ্ছে।
ভারত থেকে গরু আসবে না সরকারের এমন ঘোষণায় আশায় বুক বেঁধেছিলেন দেশি খামারিরা। তবে এখন সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে গরু আসায় লোকসানের শঙ্কায় রয়েছেন তারা। প্রশাসনের দাবি, ভারত থেকে গবাদিপশুর অনুপ্রবেশ ঠেকানো হচ্ছে। কুমিল্লায় এবার প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি পশু কুরবানির জন্য প্রস্তুত আছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদফতর।

সীমান্তের কিছু এলাকায় কড়া নজরদারি থাকলেও কয়েকটি স্থান দিয়ে অন্য বছরের চেয়ে বেশি পশু ঢুকছে এবার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে আনা হচ্ছে গরু। আর এ কাজে প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরা জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। গরু আনার কাজে দুই ধরনের লোককে কাজে নামায় চোরাকারবারি চক্র। একটি গ্রুপ গরুর সঙ্গেই থাকে; আরেকটি গ্রুপ রাস্তায় পুলিশ, বিএসএফ, বিজিবি আছে কি না, তা জেনে কারবারিকে খবর দেয়। তারা গরুপ্রতি দু-তিন হাজার টাকা করে পায়। সীমান্ত পার হওয়ার পর দেশের কোনো হাট থেকে টাকার বিনিময়ে গরু কেনার নকল কাগজপত্র তৈরি করে নেওয়া হয়। এতে পথে আর পুলিশি ঝামেলায় পড়তে হয় না।

কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার বিবিরবাজার ও সদর দক্ষিণ উপজেলার গলিয়ারা, ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার আশাবাড়ি, বুড়িচং উপজেলার ভবেরমুড়া, চৌদ্দগ্রাম উপজেলা ডিমাতলী এলাকাকে গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট হিসেবে বেছে নিয়েছে চোরাকারবারিরা। এসব এলাকা দিয়ে প্রতিনিয়ত অবাধে আসছে পশু।

কুমিল্লা অঞ্চলে মাহবুব নামে এক বেপারি প্রতিদিন ৩০০-৩৫০টি গরু হাতবদল করেন সীমান্ত এলাকায়। তিনি কক্সবাজারের উখিয়ার একটি সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়া কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার গলিয়ারা ইউনিয়নের শিপন ও রুহুল আমিন নামের আরও দুই চোরকারবারি গলিয়ারা সীমান্ত দিয়ে কুরবানিকে সামনে রেখে গরু আনছে। অভিযোগ রয়েছে, মাহবুব ও শিপনের মতো জেলাজুড়ে আরও কয়েকজন চোরাকারবারি পশু আনার কাজে সক্রিয়।

গত ৫ ও ৬ জুন ব্রাহ্মণপাড়ার আশাবাড়ি সীমান্ত এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সীমান্তের কাঁটাতারের নিচ দিয়ে ১০ ফুট থেকে ১২ ফুটের প্রায় ১০টি কালভার্ট রয়েছে। সেখানে বসে ধান শুকাচ্ছিলেন রাবেয়া বেগম ও তপুরা বেগম। তারা সময়ের আলোকে বলেন, প্রতিদিনই তো মদ, গাঁজার লগে গরুও আইতেছে। এডি আমগোরে জিগাইয়া কী লাভ। বড়লোকেগো কাম এডা। আমরা কিছু কইলে আমগোরে জিন্দা মাইরালাইবো। বিজিবির লোকেরা সবডিই তো সামনে থায়, কই কেউ তো তাগোরে কিছু কয় না। ভাই আমরা কিছু জানি না।

একই এলাকার খামারি শফিক মিয়া বলেন, চোখের সামনে দিয়ে রাতের বেলা আমগো এদিক দিয়া গরু নামতেছে। বিজিবিরা এগুলা দেইখাও কিছু কয় না। তারগো হাত শক্তিশালী। তারগোরে কেউ কিছু কইতে পারে না। কুরবানকে সামনে রেখে আমরা যারা গরু পালন করি, এভাবে গরু নামতে থাকলে আমগো বাড়িঘর বেইচ্চা দিতে হবে। সরকার কি এগুলা দেখে না।

লালমাই উপজেলার বেলঘর এলাকার খামারি মোতলেব হোসেন বলেন, ‘কুরবানি ঈদের জন্য প্রতি বছরই গরু পালন করি। কিন্তু ন্যায্য দাম পাই না। কুরবানির হাটের শেষ দিকে ভালো দাম পাওয়ার আশায় থাকি। ভারতীয় গরুর চাপে তখন আর দাম পাওয়া যায় না। গত বছরও লোকসান হয়েছিল। এবার দেখি আল্লাহ কপালে কী রেখেছেন।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ বছর কুমিল্লা নগরী ও জেলার ১৭ উপজেলায় পশুপালন করছেন ৩৬ হাজার ৫৯৮ জন খামারি। তাদের খামারে থাকা পশুর সংখ্যা ২ লাখ ৯৮ হাজার ৪৫৬। আর এবারের ঈদে জেলায় চাহিদা রয়েছে ২ লাখ ৮৮ হাজার ৭৮৮টি পশুর। সেই হিসাবে এ বছর জেলায় উদ্বৃত্ত পশুর সংখ্যা ১০ হাজার।

জেলার খামারিদের সংগঠন ডেইরি অ্যাসোসিয়েশন কুমিল্লার সভাপতি ফরহাদ হোসেন বলেন, আমরা সারা বছর পশু পালন করে লাভের স্বপ্ন দেখি। আর চোরাইভাবে ভারতীয় গরু এসে প্রতিবারই আমাদের সেই স্বপ্ন নষ্ট করে দেয়।

কুমিল্লা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা চন্দন কুমার পোদ্দার বলেন, ‘ভারতীয় পশু প্রবেশ নিয়ে আমরাও শঙ্কায় আছি। গত বছরের চেয়ে ৩ হাজারের বেশি খামারি বেড়েছে কুমিল্লায়। ভারতীয় গরু প্রবেশ করলে আমাদের খামারিরা লোকসানের মুখে পড়বে। তবে গত ৯ জুন জেলার আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বলেছেন, কোনোভাবেই ভারতীয় গরু প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।

এ বিষয়ে কুমিল্লার পুলিশ সুপার আবদুল মান্নান বলেন, আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক সভায় আমরা এই বিষয়টি গুরুত্বসহকারে আলোচনা করব। উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব।

কুমিল্লা-১০ ব্যাটালিয়ন বিজিবি (সেক্টর কমান্ডার) কর্নেল মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম মিরাজ বলেন, দেশি খামারিদের বাঁচাতে ঈদুল আজহা সামনে রেখে চোরাইপথে যেন পশু আসতে না পারে, সে জন্য সীমান্তে কঠোর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ থেকে একটি গরুও যেন অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য আলাদা গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে টহল।

বান্দরবান: দীর্ঘদিন ধরে বান্দরবানে নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহীদের লড়াই চলছে। এরপর সীমান্তে আরও সতর্ক পাহারা বাড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
সীমান্তে নিরাপত্তার মধ্যেও প্রতি বছরের মতো কুরবানির ঈদের আগে মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা দিয়ে অবৈধভাবে গরু আসছে। কয়েকটি সীমান্ত ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি এলাকাকে পাচারের জন্য নিরাপদ রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে এসব গরু পাচারকারী।

স্থানীয়রা জানান, নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম, বাইশফাড়ি, নিকছড়ি, ফুলতলী, আশারতলী, কস্তুনিয়া, ভাল্লুকখাইয়া, বামহাতিরছড়া, দোছড়ি সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন অন্তত পাঁচ শতাধিক গরু অবৈধভাবে আসছে এপারে। এ কাজে জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ব্যক্তির পাশাপাশি সাদা পোশাকের পুলিশও জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এভাবে চোরাইপথে অবাধে গরু আসার কারণে সীমান্তের এপারে খামারিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।

নাইক্ষ্যংছড়ি ঘুমধুম সীমান্তের কয়েকজন গবাদিপশু খামারি বলেন, মিয়ানমার থেকে চোরাইপথে গরু আসায় লোকসানে পড়বেন এপারের খামারিরা।

নাইক্ষ্যংছড়ি চাকঢালা সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা থোয়াইচিং চাক বলেন, সীমান্ত এলাকায় কক্সবাজার ৩৪ বিজিবি ও নাইক্ষ্যংছড়ি-১১ বিজিবির অধীনে ১৫টি বর্ডার অবজারবেশন পোস্ট রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে ৪৭-৪৮ পিলারের মধ্যবর্তী পাহাড়ি এলাকা দিয়ে মিয়ানমার থেকে চোরাইপথে গরু আনা হচ্ছে। শুধু এই সীমান্ত নয়, সীমান্তরক্ষী বাহিনী এক পয়েন্টে কঠোর হলে চোরাকারবারিরা অন্য পয়েন্ট ব্যবহার করে। প্রতিদিন নতুন নতুন রুট দিয়ে গরু আনছে চোরাকারবারিরা। পয়েন্টগুলো দুর্গম এলাকা হওয়ায় তারা পাহাড়ি পথ বেয়ে গরুগুলো সরাসরি নিয়ে যায় রামুর কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের গর্জনিয়া গরু বাজার ও ঈদগাহ বাজারে।

এ ব্যাপারে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, যেকোনো চোরাকারবারি প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থানে আছে। টাস্কফোর্স গঠন করে অভিযান চালানো হচ্ছে। বৈধ কোনো কাগজ না থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গরু জব্দ করছে।

লালমনিরহাট: সীমান্তবর্তী এলাকা লালমনিরহাটে ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে অবৈধ গরু ব্যবসায়ীরা সরব হয়েছে। জেলার আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর সীমান্ত দিয়ে নিয়মিত ভারতীয় গরু আসছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গরু পারাপারকারীদের বাধা দিতে গেলে বাধে বিপত্তি। তারা আমাদের ফসলের জমি নষ্ট করে ভারত থেকে অবৈধভাবে গরু আনছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ করলেও কোনো প্রতিকার মিলছে না।

এদিকে জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার ভেলাগুড়ি ইউনিয়নের সীমান্ত দিয়েও রাতে গরু আসছে। সেখানকার স্থানীয়রা জানান, লালমনিরহাট কাস্টমস থেকে বিভিন্ন সময়ে নিলামে নেওয়া গরুর কাগজ দেখিয়ে স্থানীয়ভবে ভারত থেকে আনা এসব গরু বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন হাটে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিএফএ) সভাপতি মো. ইমরান হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে পশু কুরবানি উপলক্ষে ভারত ও মিয়ানমার থেকে গরু আসছে। এ কারণে লোকসানের শঙ্কায় রয়েছেন হাজার হাজার খামারি। এমন পরিস্থিতিতে সীমান্ত পথে গরু আসা বন্ধে কঠিন নজরদারির দাবি জানান তিনি।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category